আহত জুলাই যোদ্ধাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশনের কর্মশালা

জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত ও আহত ব্যক্তিদের মানসিক সুস্থতা ও সহযোগিতা দিতে বিশেষ কর্মশালা করেছে অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশন।

রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসে রোববার (৭ জুন) বিকেলে আহত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য এই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে কর্মশালা আয়োজন করা হয়।

এ দিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের জন্য দেশ ও বিদেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। আর কর্মশালাটি পরিচালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন হেলথ-এর চিকিৎসক ড. আবদুল্লাহ হাসান।

কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী কমিটির ট্রেজারার বীর প্রতীক কর্নেল (অব.) আব্দুস সালাম।

কর্মশালায় ট্রমা মোকাবিলা, মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা, পারিবারিক সহায়তা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সুস্থতা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অংশগ্রহণকারীদের জন্য এটি ছিল একটি নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে তারা তাদের অভিজ্ঞতা ও মানসিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পান এবং পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় সহায়ক বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে জানতে পারেন।

অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশনের এটি ছিল দশম মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মশালা আয়োজন।

একটি স্বেচ্ছাসেবী, অলাভজনক মানবিক সংগঠন হিসেবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয় অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশন, যা জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত ও আহত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে কাজ করছে। চিকিৎসা সহায়তা, জীবিকাভিত্তিক সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, অস্থায়ী আবাসন এবং জরুরি মানবিক সহায়তার মাধ্যমে ফাউন্ডেশনটি একটি সমন্বিত পুনর্বাসন মডেল বাস্তবায়ন করছে।

তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল শনিবার সারা দেশ থেকে আগত জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঢাকার অদূরে গাজীপুরে দিনব্যাপী পারিবারিক মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা দিনব্যাপী একসঙ্গে সময় কাটানো, খেলাধুলা, বিনোদনমূলক কার্যক্রম, দলীয় অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক মতবিনিময়ের সুযোগ পান।

এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য একটি নিরাপদ, সম্মানজনক এবং সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা সাময়িকভাবে দৈনন্দিন সংগ্রাম থেকে মুক্ত হয়ে মানসিক স্বস্তি ও সামাজিক সংযোগ অনুভব করতে পারেন।

অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগের ৫০ জন আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সহায়তা প্রদান করেছে এবং সরাসরি ১৬৪ জন পরিবারের সদস্যকে সহায়তা করেছে।

অনলাইনে যুক্ত হয়ে অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. পারভীন রহমান বলেন, ‘পুনর্বাসন শুধু চিকিৎসা বা আর্থিক সহায়তার বিষয় নয়। এটি মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস, আশা এবং সমাজে পুনঃঅন্তর্ভুক্তির সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। আমাদের লক্ষ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা যেন অনুভব করেন তারা একা নন।’

কর্মশালায় অংশ নিয়ে সিলেটের বাবনা পয়েন্টে আহত হয়ে একটি চোখ হারানো ১৯ বছর বয়সী মিজান আহমেদ বলেন, ‘‘জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার পর শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিকভাবেও অনেক কঠিন সময় পার করেছি। অপরাজিত ফাউন্ডেশনের বেশ কিছু কর্মশালায় এসে নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ পেয়েছি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সহযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। এটি যেন আমার মতো আহত অন্যদের জন্যও ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকে।’

অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশন ভবিষ্যতেও একটি সমন্বিত পুনর্বাসন কাঠামোর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ও আহত ব্যক্তিদের পাশে থাকবে, যাতে তারা মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনে এগিয়ে যেতে পারেন।

কর্মশালায় আরও বক্তব্য দেন অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ড. এম মুস্তাজিব হায়দার। জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিজেদের আহত হওয়া ও তার পরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন হবিগঞ্জ থেকে আসা বাম চোখ হারানো ও ডান চোখের ৫৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারানো শাইনুর মিয়া, ঢাকার মিরপুরের ডান চোখ হারানো নূর হোসেন, মগবাজারের দু চোখ হারানো সাব্বির আহমেদ, এক চোখ হারানো রুবেল হোসেন, বাম পা হারানো জুনায়েদ আহমেদ, মিজান আহমেদ।

এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আলিফ হোসেন, ইব্রাহিম মিয়া, সাকিবুল হাসান, আশরাফুল ইসলাম, রাকিবুল ইসলাম, রাফিউল ইসলাম রবি, শাহেদুল ইসলাম সাকিব, ইয়াসিন, নুর করিম শুভসহ বেশ কয়েকজন জুলাই যোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।

Scroll to Top